ময়মনসিংহ - ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ || ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭

শিরোনাম

আমাদের করিম স্যার শিবলী জামান

আমাদের করিম স্যার শিবলী জামান

মানুষের নাম দু’ভাবে ছড়ায় – ইতিবাচক ভাবে এবং নেতিবাচক ভাবে। করিম স্যারের নামটা ছড়িয়েছে ইতিবাচক ভাবে। এই নামটা বলার এবং শোনার সময় আমাদের মনের ক্যানভাসে একজন মানুষের ছবি দেখি। আর যিনি মানুষ তিনিই বড়। করিম স্যার আমাদের সেই বড় মানুষ , ভালো স্যার। আমাদের বাসা আর স্কুলের মাঝখানে স্যারের বাসা। একচিলতে ঊঠোনের পর একটা টিনের ঘর। যেখানে তিনি সকাল বিকাল ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াতেন। আর তারা সবাই ছিল স্কুলের উঁচু ক্লাসের শিক্ষার্থী। সেই ১৯৮৪ সালে আমি যখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই তখন থেকে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় দেখতাম স্যার হয়তো ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন নতুবা ছাত্র ছাত্রীদের কিছু একটা পড়াচ্ছেন। মনে মনে ভাবতাম আমি যখন উচুঁ ক্লাসে উঠবো তখন আমিও এখানে পড়বো। শুধু আমি না নিকলীর সকল শিক্ষার্থীদের মনেই এই ইচ্ছেটা লুকিয়ে থাকতো । নিদেন পক্ষে ক্লাস নাইনে উঠতে পারলে সুযোগ পাওয়া যেতো। আমাদের বড় ভাই বোনেরা স্যারের কাছে পড়েছেন, আমরা পড়েছি, আমাদের পরেও আরো অনেকে পড়েছেন। তিনি ছিলেন নিকলী শহীদ স্মরনিকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর আমরা পড়তাম নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সুতরাং সরাসরি ক্লাসে বসে স্যারের কাছে পড়ার সুযোগ ছেলেদের ছিল না। আমরা প্রাইভেট পড়তাম। তখনকার সময়ে প্রাইভেট পড়াটা এমন বানিজ্যিক ছিলনা। সেখানে ছিল স্নেহ, আদর; ছিল বাৎসল্য। একটা ব্যাচে বড় জোর পাঁচ থেকে ছয়জন পড়তাম। আমি প্রথম সুযোগ পাই ১৯৯১ সালে ক্লাস এইটে পড়ার সময় বছরের একেবারে শেষে। তখন স্কুল গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে স্যার কিছুটা সময়ের জন্য অবসর পেয়েছেন। আমার এইটের বৃত্তি পরীক্ষার তখন একুশ দিন বাকী। সকাল আটটার দিকে আমি একা গণিত পড়ার জন্য স্যারের সেই ছোট্ট টিনের ঘরটাতে প্রথম পা দিলাম। প্রথম দিনই তিনি আমাকে খুব আন্তরিক ভাবে গ্রহন করলেন যদিও আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম। জ্যামিতি দিয়ে আমার পড়া শুরু হলো এবং আমি মাত্র ষোল দিন পড়ার সুযোগ পেলাম। আর এই অল্প ক’দিনেই কোন সে রুপকথার যাদুর কাঠির স্পর্শে চিরদিনের জন্য আমার গণিত ভীতি দূর হয়ে গেল। আমি প্রথম বারের মত শেখার এক অপূর্ব কৌশলের সঙ্গে আনন্দের স্বাদ পেলাম। এরপর ক্লাস নাইনে উঠে আমি, সজল, হোসাইন, জামরুল, নজরুল স্যারের কাছে উচ্চতর গণিত পড়তাম। সেটা দিয়ে শুরু করলেও পরে বাংলা, ইংরেজি সবই পড়েছি। স্যারের প্রধান বৈশিষ্ট ছিল বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ানো। বর্তমান সময়ে এবং সেই সময়েও “ইমপোর্টেন্ট” নামে দাগ দিয়ে পড়ানোর যে প্রচলিত পদ্ধতি স্যারের কাছে এমন কোন শর্টকাট ব্যাপার ছিল না। পড়তে গিয়ে প্রায়ই অপরিচিত শব্দ, বাগধারা,প্রবাদ প্রবচন,সাধারণ নিয়মের ব্যাতিক্রম এমন অনেক বিষয় সামনে চলে আসতো। তিনি আমাদের সেগুলোর ব্যতিক্রম হওয়ার পেছনের গল্পটা শোনাতেন। আর সেই গল্পটাই আমাদের শিখনটাকে সহজ, সরল, আনন্দময় করে তুলতো। সর্বোপরি তিনি শিক্ষার্থীদের প্রবনতাটা খুব সহজে ধরতে পারতেন আর তাকে বুঝানোর জন্য সেই অনুযায়ীই একটা লেসন তৈরি করতেন। এমন নিবেদিত প্রাণ একজন শিক্ষকের প্রয়ান আমাদের দুঃখের ডালি আরো ভারী করলো। স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই তবুও তিনি চিরদিন আমাদের মনের মাঝে থাকবেন।তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কমনা করছি।মহান সৃষ্টিকর্তা স্যারকে জান্নাতবাসী করুন।

এই বিভাগের আরও খবর