ময়মনসিংহ - ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ || ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭

শিরোনাম

নায়করাজ রাজ্জাক:চিরদিনের নায়ক

চিরদিনের নায়ক


আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি নায়করাজ রাজ্জাক নামে সুপরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়করাজ উপাধি দিয়েছিলেন।
নায়করাজ রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর হোসেন ও মাতার নাম নিসারুননেছা। রাজ্জাকরা ছিলেন নাকতলা এলাকার জমিদার। তিনি কলকাতার বাশদ্রোণীর নিকটে খানপুর হাইস্কুলে পড়াশুনা করেন। স্কুলে তিনি অঙ্কে কাঁচা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাজ্জাকের বাল্যবন্ধু টি দাস বলেন, স্কুলের শিক্ষকেরা তাকে বলতেন, “অঙ্কটা অন্তত ভালো করে শেখ। যোগ বিয়োগ ঠিকঠাক করে না শিখলে পরিবারের এত সম্পত্তি সামলে রাখবি কি করে।”
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা।অভিনয়ের জন্য ১৮ বছর বয়সে মুম্বইয়েও যান রাজ্জাক।
রাজ্জাক ১৯৬২ সালে লক্ষ্মীকে বিয়ে করেন।টালিগঞ্জে রাজ্জাকের এক আত্মীয়ের বাড়ির পাশে ছিল লক্ষ্মীদের বাড়ি। সেই আত্মীয়দের একজন লক্ষ্মীকে বাড়ির সামনে দেখে পছন্দ করে এবং বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্জাক আর লক্ষ্মীর আংটিবদল হয়। এর দুই বছর পরে তাদের বিয়ে হয়। নিজের নাম প্রসঙ্গে লক্ষ্মী দৈনিক প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “অনেকেই আমাকে হিন্দু মনে করেন। আমার পুরো নাম খায়রুন্নেসা। আমার আব্বা আমাকে আদর করে ডাকতেন ‘লক্ষ্মী’ বলে।”
১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরের দিন ২৬ এপ্রিল পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার সাথে ছিল তার স্ত্রী লক্ষ্মী ও পুত্র বাপ্পারাজ এবং পীযূষ বসুর দেওয়া একটি চিঠি ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা।
একসময় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক বলেন, “আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি। না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনদিন আসেনি। ওটা আসেনি বলেই আজকে আমি এতদূর শান্তিতে এসেছি।”
স্ত্রী পুত্রকে শরণার্থী শিবিরে রেখে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সাক্ষাৎ করলে খান তাকে আশ্বাস দেন। তখন রাজ্জাক ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কমলাপুরে এক বাসা ভাড়া করেন। পরে তিনি সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামসহ আরও চলচ্চিত্রকারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আব্দুল জব্বার খানই তাকে ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কামাল আহমেদের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে উজালা চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল পরওয়ানা। কিন্তু ৮০ ভাগ কাজ হওয়ার পর তিনি এই ছবির কাজ ছেড়ে দেন।
১৯৬৬ সালে সালাউদ্দিন পরিচালিত হাসির সিনেমা ‘তেরো নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজ্জাক ঢাকায় তার অভিনয়জীবনের সূচনা করেন। এরপর নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয় জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এতে তার বিপরীতে ছিলেন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে। ৬০-এর দশকের শেষ থেকে ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে জনপ্রিয়তার চূঁড়ায় ওঠেন রাজ্জাক। একে একে নায়ক হয়েছেন তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে।
ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকেও তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত।
অভিনয় জীবনে রাজ্জাক দর্শকনন্দিত চলচিত্র
বেহুলা,ওরা ১১ জন, ছুটির ঘণ্টা,নীল আকাশের নিচে, ময়নামতি, মধুমিলন, পিচঢালা পথ, যে আগুনে পুড়ি, জীবন থেকে নেয়া,
কী যে করি, অবুঝ মন, রংবাজ, বেঈমান, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, অনন্ত প্রেম, বাদী থেকে বেগম,আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা,এবং বড় ভালো লোক ছিলসহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি সব মিলিয়ে ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার মালিকানার রাজলক্ষী প্রোডাকশন থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
প্রযোজক হিসেবে নায়করাজের যাত্রা শুরু ‘রংবাজ’ ছবিটি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে। এটি পরিচালনা করেছিলেন জহিরুল হক। এখানে রাজ্জাকের বিপরীতে ছিলেন কবরী। ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে নায়করাজ প্রথম নির্দেশনায় আসেন ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্র দিয়ে। এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। নায়ক হিসেবে এ অভিনেতার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’। এতে তার বিপরীতে ছিলেন নূতন।
নায়করাজ রাজ্জাক সর্বশেষ তার বড় ছেলে নায়ক বাপ্পারাজের নির্দেশনায় ‘কার্তুজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চলচ্চিত্রে তার ঘনিষ্ঠবন্ধু প্রয়াত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামও অভিনয় করেছিলেন। চাষী নজরুল ইসলামের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমার নায়কও ছিলেন রাজ্জাক।
বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও পরিচিত ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ্জাক যখন রাজত্ব করছেন, সে সময় পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রের দাপট ছিল বাংলাদেশের দর্শকদের মাঝে।
কিন্তু সে সময় নায়ক রাজ্জাক তার একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ্জাক যে দাপট এবং অভিনয় প্রতিভা রেখে গেছেন সেটি অনেক দিন টিকে থাকবে দর্শকদের মনে।
নায়করাজ সর্বশেষ ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘আয়না কাহিনী’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রে জুটি হিসেবে অভিনয় করেছিলেন সম্রাট ও কেয়া। এরপর আর নতুন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণে তাকে দেখা যায়নি।
বিশাল এই ক্যারিয়ারে সাতবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন নায়করাজ রাজ্জাক। চলচ্চিত্রের জন্য আজীবন সম্মাননাসহ আরও অনেক পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়।এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি প্রথম সভাপতি ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। ২০১৭ সালের ২১শে আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর পর তাকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বাপ্পারাজ, সম্রাট, শাকিব খান ও জায়েদ খান- এই চার নায়কের কাঁধে চড়ে শেষ নিদ্রায় যান ঢাকাই সিনেমার রাজা রাজ্জাক।
আজ এই গুণী শিল্পীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী।
মৃত্যুবার্ষিকীতে কীর্তিমান এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এই বিভাগের আরও খবর