ময়মনসিংহ - ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ || ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭

শিরোনাম

পুলিশ সংস্কার কবে হবে?

পুলিশ সংস্কার

পুলিশকে নতুন রূপে দেখতে চায় সরকার। আবার সরকারই ১৩ বছর ধরে আটকে রেখেছে পুলিশ সংস্কারের জন্য প্রস্তাবিত একটি অধ্যাদেশ, যেটি ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭’ নামে পরিচিত। পুলিশকে আরও জনবান্ধব ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ওই সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) এস এম শাহজাহানের নেতৃত্বে একটি কমিটি পুলিশ সংস্কারের খসড়া অধ্যাদেশ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলার তৃণমূল পর্যায় থেকে জনমত সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু প্রায় ১৩ বছরেও অধ্যাদেশটি আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা প্রসঙ্গটি প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহের সময় নানা মহলে আলোচনায় ওঠে। এর পরই আবারও চাপা পড়ে যায়। অথচ পুলিশ বাহিনীর বিপন্ন ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে দায়িত্ব পালনে বিরাজমান অসুবিধা দূর করে তাদের একুশ শতকের প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ে তোলাই এ সংস্কারের লক্ষ্য ছিল বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে কথা বলে জানা যায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব পুলিশের সংস্কারে বড় বাধা। তারা বলেন, প্রশাসন মনে করে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাতে পুলিশের ওপর মন্ত্রণালয়ের ‘খবরদারি’ কমে যাবে। একই সঙ্গে পুলিশে রাজনৈতিক প্রশাসনের হস্তক্ষেপে লাগাম টানা হয়েছে ওই অধ্যাদেশে। ফলে অধ্যাদেশটির বিষয়ে এ দুই পক্ষ আন্তরিক নয়। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ অধ্যাদেশ-২০১৩ (খসড়া) যাচাই-বাছাইয়ে কমিটি করেছিল। কিন্তু তার রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘদিন ধরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিমাগারে বন্দী হয়ে আছে। তবে রাজনৈতিক শক্তি যদি আন্তরিকতার সঙ্গে চায় তাহলে এটা আলোর মুখ দেখতে পারে। এতে পুলিশের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সাধারণ মানুষও এ বাহিনীর কাছ থেকে প্রকৃত সেবাটা পাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুলিশের সংস্কার সময়ের দাবি। এখনো এ বাহিনী সেই ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৬১ সালের শোষণমূলক আইনেই চলছে। তখন মানুষকে শোষণ করার জন্য আইনটি করা হয়েছিল। ২০০৩ সাল থেকে দেখছি, ইউএনডিপিও পুলিশ সংস্কারের একটি জায়গায় এসে আটকে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশকে ফোর্স বলা হচ্ছে। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এ বাহিনী এখনো সাধারণ মানুষের বাহিনী হতে পারেনি। সেই আইনের কারণে এখনো পুলিশ ভিআইপি, ভিভিআইপি এবং বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার দাবি থাকবে- পুলিশের আধুনিকায়ন না হলে জাতির ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, পুলিশের যুগোপযোগী একটি আইনের উপলব্ধি করে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনুযায়ী পুলিশের সংস্কার অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। জনমত বা মতামত যাচাই এখনো করা হয়নি। এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। পুলিশে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুুলিশকে যুগোপযোগী, জনবান্ধব, পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশের সংস্কার প্রয়োজন। এ ছাড়া পুলিশের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং পুলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ আইনের প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন হলে পুলিশ বাহিনী আরও সুনাম, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুলিশ বাহিনীকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনকে যুগোপযোগী করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল। সে বছরই খসড়া প্রণয়ন করে ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭’ নামে প্রস্তাবটি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করা হয়। এর পর থেকেই চলছে জনমত গঠন, যাচাই-বাছাইসহ নানা কার্যক্রম।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭’ নামে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা যুগোপযোগী একটি প্রস্তাব। উন্নত রাষ্ট্রের পুলিশ কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে করা হয়েছে। পুলিশ অধ্যাদেশে এমন কিছু বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে পুলিশের বিদ্যমান অনেক সমস্যা দূর হবে। যেমন- পুলিশ সদস্যদের ওপর রাজনৈতিক খবরদারি করার সুযোগ থাকবে না, চার স্তরে পুলিশের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে, জাতীয় পুলিশ কমিশন, অভিযোগ কমিশন, নীতিনির্ধারণী গ্রুপ গঠন ইত্যাদি বিধান কার্যকরের মধ্য দিয়ে পুলিশের ব্যাপক সংস্কার হবে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ বিভাগের জন্য পৃথক পুলিশ বিভাগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যে বিভাগের প্রধানের পদবি হবে ‘চিফ অব পুলিশ’। চিফ অব পুলিশের অধীনে থাকবেন ইন্সপেক্টর জেনারেল, অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল থেকে শুরু করে পুলিশের অন্য পদবির কর্মকর্তারা। পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলদের মধ্য থেকে একজনকে সরকার চিফ অব পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেবে।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পুলিশের চাকরির পাশাপাশি খ-কালীন অন্য চাকরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ জরুরি কোনো কাজে যে কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করার বিধান রাখা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপার অথবা চিফ অব পুলিশ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে কোনো কর্মকর্তা সরকারের অনুমতি নিয়ে এ বিশেষ পুলিশ নিয়োগ করতে পারবেন। সেসব ব্যক্তি বেতন-ভাতা পাবেন।
পুলিশ সদর দফতরসূত্রে জানা গেছে, পুলিশ রিফর্ম প্রজেক্টের (পিআরপি) অধীনে ২০০৭ সালে প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। তখন অধ্যাদেশটি অনুমোদন করার আগে জনমত যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। অধ্যাদেশ অনুমোদনের পক্ষে ৭০ হাজার লোক মত দেন। মতামতসহ অধ্যাদেশটি আবার তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়। তিনি অভিমতসহ অধ্যাদেশটি পর্যালোচনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠন করা হয় পর্যালোচনা কমিটি। এ কমিটি অধ্যাদেশের ২৩টি ধারাসহ কয়েকটি উপধারার ব্যাপারে আপত্তি জানায়।
যেসব ধারা নিয়ে আপত্তি জানায়, এর মধ্যে ৭ নম্বর ধারায় পুলিশের আইজি নিয়োগ প্রক্রিয়া, ৮ নম্বর ধারায় এএসপি নিয়োগ, ১০ নম্বর ধারার ১ উপধারায় সরকার কর্তৃক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকা, ১১ নম্বর ধারায় পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা, ১২ নম্বর ধারায় ইউনিটপ্রধানের ক্ষমতা, ১৩ নম্বর ধারায় পুলিশের আইন উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, ১৫ নম্বর ধারায় জেলা পুলিশ সুপারের ক্ষমতা, ৩৭ নম্বর ধারায় জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন, ৬৮ নম্বর ধারায় পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি, ৯৮ ধারায় পুলিশপ্রধানের ক্ষমতার বিধান রাখা হয়। সেগুলো সংশোধন করে ২০১৩ সালে ফের একটি প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ করা হয়; যা এখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
পুলিশের দাবি হচ্ছে, এ বাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কার করতে হলে পুরনো আইন সংস্কার করে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুলিশ পরিচালনা, কল্যাণ ও এ বাহিনীকে আধুনিকায়নে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে অধ্যাদেশ তৈরি করে। কিন্তু এ অধ্যাদেশ প্রণয়নের কাজ আর এগোয়নি। এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। অধ্যাদেশে পুলিশের ক্ষমতায়নে এমন কিছু ধারা লিপিবদ্ধ করা হয়, যার বিরোধিতা করে সরকারের একটি অংশ। পরে ঝুলে যায় অধ্যাদেশটি।
তার পরও প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের আলোকে পুলিশের কিছু দাবি-দাওয়া পূরণ করা হয়। এর মধ্যে পুলিশপ্রধানকে দেওয়া হয় সিনিয়র সচিবের মর্যাদা। পুলিশ মহাপরিদর্শকের পাঁচটি পদ সৃষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরও ১৮৬১ সালের পুরনো আইন সংস্কার করে নতুন আইন প্রণয়নে সরকার এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন ফোরামে পুলিশের পক্ষ থেকে আইনটির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। সরকারের উচ্চমহলকে বোঝাতে সক্ষম হয় পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা ও গতিশীলতার জন্য আইন সংস্কার প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের বড় ধরনের পরিবর্তনে আইনি সংস্কার খুবই জরুরি। পুলিশের জনবল ও কাজের পরিধি বেড়েছে। কিন্তু এটি পরিচালিত হচ্ছে ১৮৬১ সালের সেই পুরান আইন দিয়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ পুরনো আইন দিয়ে পুলিশ পরিচালনা দুরূহ। এ বাহিনীকে আরও দক্ষ ও আধুনিকায়ন করতে আইনি সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের জীবন। পাল্টাচ্ছে অপরাধের ধরন। এসবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তির সংযোজন। পুলিশ সেবা বাহিনী হিসেবে মানুষের জীবন ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী নিজেদের গঠন করবে। পুলিশের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, দেশে-বিদেশে ট্রেনিং, আন্তর্জাতিক সংযোগ ঘটিয়ে তথ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করতে হবে। যথাযথভাবে সঠিক সময়ে পুলিশের সংস্কার না করা হলে জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি হবে। ফলে পুলিশকে জনমুখী ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশের সংস্কার জরুরি বলে মনে করছি। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সময়োপযোগী ও যুগোপযোগী করে এ আইনের সংস্কার প্রয়োজন। এ আইন সময়ের দাবি। এতে পুলিশের সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।

মির্জা মেহেদী তমাল ও আলী আজম
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এই বিভাগের আরও খবর