ময়মনসিংহ - ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ || ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮

শিরোনাম

ময়মনসিংহের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে (পর্ব- এক)

ময়মনসিংহের ইতিহাস ঐতিহ্য

এই প্রথম বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলার প্রাচীন থেকে বর্তমান ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে খুঁজে বের করেছে ময়মনসিংহ নিউজ লেখাটি দীর্ঘ হওয়ায় খণ্ড আকারে প্রকাশিত হবে।

ময়মনসিংহ মধ্য বাংলাদেশে অবস্থিত একটি বিস্তৃত অঞ্চল। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা ছিল বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা। অন্যদিকে ময়মনসিংহ শহরটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম শহর। বাংলা সাহিত্যের অনেক প্রাচীন পুস্তকেও এই শহরের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ময়মনসিংহের ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ হচ্ছে মৈমনসিংহ গীতিকা যা প্রাচীন পুঁথি ও লোকগাঁথার সংকলন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ময়মনসিংহ বলতে এখানে সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ বর্তমান ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কিশোরঞ্জ এবং গাজীপুর জেলা বোঝানো হয়েছে। এখানে প্রাচীনকাল বিবেচনায় নিলে এই অঞ্চলগুলোকে পৃথকভাবে দেখার অবকাশ নেই।

 প্রাচীনকাল বলতে এখানে বৈদিক কাল (খ্রি. পূ্. ২৫০০ অব্দ) থেকে শুরু করে মহাভারতের কাল হয়ে কালীদাসের সময় পর্যন্ত ইতিহাসকে বোঝানো হয়েছে। আর্যরা বহু পূর্বে ভারতবর্ষে আগমন করে অনার্যদের বিতাড়িত করে। তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিমে সুলেমান গিরিপুঞ্জ থেকে পূর্বে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে সিন্ধু নদ পর্যন্ত। বেদে বঙ্গদেশের কোন উল্লেখ নেই, সুতরাং এটি তখন অরণ্যসংকুল এবং অনার্যদের আবাস ছিল অথবা পূর্বাংশের এই ভূমিটি তখনও বঙ্গোপসাগরে নিমজ্জিত ছিল। এরপর আসে সংহিতার কাল। মনুসংহিতায়ও বঙ্গদেশের উল্লেখ নেই। তবে অনুমানের উপর বলা হয় এই অঞ্চল তখন আর্য্যাবর্ত্তের মধ্যে ছিল তবে এখানে আর্য্যধর্ম প্রসার লাভ করেনি। তাই এসময়ে বর্তমান ময়মনসিংহ অঞ্চলের কোন অস্তিত্বের কথা জানা যায়না।

এরপর আসে রামায়ণ এবং মহাভারতের কাল। রামায়ণ ও মহাভারতে বঙ্গের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। রামায়ণে অঙ্গ, বঙ্গ, মগধ, কাশী, কোশল প্রভৃতি অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে; তবে এদের অবস্থানের কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। মহাভারত অধ্যয়ন করলে অবস্থানের যে ধারণা পাওয়া যায় তা এরকম: প্রথমত, ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে বঙ্গদেশ নামে একটি রাজ্য ছিল; দ্বিতীয়ত, সেই দেশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল; তৃতীয়ত, তখনকার সময়েও তাম্রলিপ্তের (বর্তমান তমলুক) অস্তিত্ব ছিল এবং চতুর্থত, বঙ্গদেশ অতিক্রম করে পূর্বদিকে লৌহিত্য প্রদেশ এবং তার পূর্বে লৌহিত্য সাগর বিদ্যমান ছিল। এছাড়া বঙ্গের উত্তর সীমা হিসেবে এখানে প্রাগ্‌জ্যোতিষ  দেশের উল্লেখ রয়েছে। তবে এই আলোচনায় ব্রহ্মপুতের অবস্থান জানা যায়না; আর ময়মনসিংহ অঞ্চল চিহ্নিতকরণের জন্য ইটিই জানা প্রয়োজন। মহাভারতের বিস্তৃত আলোচনায় জানা যায় ব্রহ্মপুত্র নদ তখন লৌহিত্য সাগর নামে পরিচিত ছিল যা ব্রহ্মকুণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে হিমালয়ের পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বিধায় আর্য্যবর্ত্তের মধ্য দিয়ে যায়নি। পরশুরাম প্রতিষ্ঠিত লৌহিত্য তীর্থ বলতে এই লৌহিত্য সাগরকেই বুঝানো হয়েছে। মূলত ব্রহ্মপুত্র নদী সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে বলেই এদের সঙ্গমস্থলের নাম সাগর হয়েছে।

এছাড়া তাম্রলিপ্ত, করতোয়া ও বৈতরণীর উল্লেখ থেকে জানা যায় যে মহাভারতীয় যুগে ময়মনসিংহ জেলাসহ বঙ্গদেশের প্রায় ৩/৪ অংশ লৌহিত্য সাগরে নিমজ্জিত ছিল। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরাও এর সাথে একমত হয়েছেন; গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মুখানীত কাঁদা হতেই বঙ্গভূমির সৃষ্টি হয় বলে তারা অনুমান করেন। কারণ হিমালয়ের সন্নিহিত অঞ্চলেও অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কাল ও অন্যান্য নিদর্শন পাওয়া গেছে।এর সাথেই ভেসে উঠে বর্তমান ময়মনসিংহ অঞ্চল। এরপর প্রায় ৩০০০ বছর অতিবাহিত হয়, এই সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায় পুরাণে। প্রকৃতপক্ষে এই সময়েই লৌহিত্যগর্ভ থেকে বঙ্গদেশ উত্থিত হচ্ছিল এবং সেই সাথে ব্রহ্মপুত্র তীর্থরাজ হিসেবে এই দেশে পূজিত হচ্ছিল। খ্রিস্টীয় অব্দের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই বলা যায় এই দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার লাভ করে এবং শাসনকর্তার ভূমিকা পালন করেন বৌদ্ধ রাজারা। এই সময় আনুমানিক ৩০২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের নির্দেশে গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস ভারতবর্ষে আসেন। এই ভ্রমণ নিয়ে তিনি লেখেন ইন্ডিকা নামীয় গ্রন্থটি। এই গ্রন্থের মানচিত্র থেকে জানা যায় তখন ময়মনসিংহ অঞ্চল বিস্তৃত কামরুপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কামরুপের মূল সীমানা ছিল পূর্ববঙ্গসহ উত্তর-পশ্চিমে মিথিলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মগধ পর্যন্ত। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০ অব্দে মহারাজ অশোক মগধের সিংহাসনে আরোহণ করে ভারতবর্ষের প্রায় সমগ্র অঞ্চল দখল করলেও বঙ্গদেশ দখল করতে পারেননি। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মগধ রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন রাজা সমুদ্রগুপ্ত। এই শতাব্দীর শেষ দিকে কামরুপ তথা সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং সমতট (ঢাকা, ফরিদপুর) মগধের অধীনে আসে।

এরপর ৬২৯ থেকে ৬৪৫ সালের মধ্যে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতবর্ষে আসেন। হিউয়েন সাঙ পুণ্ড্রবর্ধন থেকে একটি বিশাল নদী অতিক্রম করে কামরুপ আসেন। তখন কামরুপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলো ছিল: আসাম, মণিপুর, কাছাড়, ময়মনসিংহ এবং শ্রীহট্ট আর এর শাসনকর্তা ছিলেন কুমার ভাস্কর বর্ম্মণ। হিউয়েন সাঙ’র বর্ণনা থেকে জানা যায় ব্রহ্মপুত্রের পূর্বে অবস্থিত বর্তমান পূর্ব ময়মনসিংহ ছিল কামরুপের অধীনে আর এই নদের পশ্চিমে অবস্থিত বর্তমান পশ্চিম ময়মনসিংহ ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের অধীনে। সপ্তম শতাব্দীতে হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের ফলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব মলিন হয়ে যায়। এর মূলে ছিল তন্ত্রাদির আবির্ভাব। এই সময়ের যোগিনীতন্ত্র পাঠ করলে তখনকার সময়ে কামরুপের অবস্থান জানা যায়। তন্ত্রমতে করতোয়া থেকে দ্দিকরবাসিনী পর্যন্ত বিস্তৃত কামরুপের উত্তরে ছিল কঞ্জগিরি, পশ্চিমে করতোয়া, পূর্বে দিক্ষু নদী এবং দক্ষিণে লাক্ষ্ণা নদী। ৮ম শতাব্দী থেকে ১০ম শতাব্দী পর্যন্ত ময়মনসিংহের যে অংশ ৭ম শতাব্দীতে পুণ্ড্রবর্ধনের অধীন ছিল তা আবার কামরুপের অধীনে আসে।

৭৫৬ সাল থেকে ১১৬২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর পাল রাজবংশ বঙ্গ ও বিহার শাসন করে। তন্মধ্যে প্রথম ১২০ বছর অধিক গুরুত্বপূর্ণ; এই সময় ময়মনসিংহের কাপাসিয়া, রায়পুরা ও ধামরাই নামক অঞ্চলে শিশুপাল, হরিশ্চন্দ্র পাল এবং যশোপাল নামক তিনজন ক্ষুদ্র নৃপতি শাসন করেন। এছাড়া পশ্চিমাংশে মধুপুর অঞ্চল শাসন করেন পালরাজ ভগদত্ত (মহাভারতে উল্লেখিত ভগদত্ত নন)। ভাওয়ালের বনের গভীরে শিশুপালের বিশাল দীর্ঘ রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ এখনও অস্তিত্বশীল। মধুপুরেও মহারাজ ভগদত্তের স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্ট আছে: তার গৃহভগ্নাবশেষ, পুকুর, বারতীর্থ দীঘি, দেবালয় এবং মদন গোপালের বাড়ি। এখনও এই বারতীর্থাশ্রমে মেলা ও পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

দশম শতাব্দীতে পাল বংশের রাজত্ব যখন চলছে তখনই সেন বংশের উত্থান ঘটে। এই বংশের প্রতিষ্ঠা করেন বীরসেন বা আদিশূর। তিনি বিক্রমপুরে (বর্তমান রামপাল) রাজধানী স্থাপন করে সমতট এবং দক্ষিণ বঙ্গ শাসন করেন। তার প্রপৌত্র বিজয়সেন এতদ্ব্যতীত মদ্র, কলিঙ্গ, কামরুপ দখল করেন। তাই সে সময় ময়মনসিংহ বিজয়সেনের অধীনে ছিল; আর এখানকার ক্ষুদ্র পাল নৃপতি শাসিত অঞ্চলগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। বিজয়সেনের পর তার পুত্র বল্লালসেন (১১৬০ – ১১৭৮) রামপালের সিংহাসনে সমাসীন হয়ে বঙ্গকে ৫ ভাগে ভাগ করেন: রাঢ়, বাগড়ি, বারেন্দ্র, মিথিলা এবং বঙ্গ। এই ভাগ থেকে জানা যায় তখন পশ্চিম ময়মনসিংহ বঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেন রাজা কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল। আর পূর্ব ময়মনসিংহ (ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পার) কামরুপের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে দুইটি সন্দেহের অবকাশ রয়েছে:

  • ঐতিহাসিক হ্যামিল্টনের মতে বঙ্গের সীমানা উপর্যুক্ত বর্ণনার মত হলেও অনেক ঐতিহাসিক তা স্বীকার করেন না।
  • ময়মনসিংহের যে অংশ কামরুপের অধীন বলা হয়েছে তাও অনেকের মতে বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রথম সন্দেহের ক্ষেত্রে বলতে হয়, প্রত্নতত্ত্ববিদ কৈলাশচন্দ্র সিংহ হ্যামিল্টনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষন করেন। তার এই মতের সাথে ব্লকম্যানের মতের মিল রয়েছে। তবে সকল দিক বিবেচনায় হ্যামিল্টনের মতই অধিক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। দ্বিতীয়ত সন্দেহর নিরসন হয়েছে বল্লালসেনের অসবর্ণা স্ত্রী গ্রহণ এবং পূর্ব ময়মনসিংহে মানব বসতি স্থাপনের সূচনার কাহিনী থেকে। আনন্দভট্ট রচিত বল্লালচরিত গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এই মতে, বল্লালসেন ক্ষমতা দখল করে কৌলিন্য প্রথা প্রচলন করেন। এতে প্রাচীন বাহ্মণ, কায়স্থ এবং বৈদ্যদের মধ্যে বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। এমন সময় তিনি নিজ বর্ণের ভিন্ন বর্ণের (ডোম) এক নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এই নারীর অন্ন গ্রহণে সকলকে বাধ্য করেন। এতে জাত রক্ষার তাগীদে অনেক ব্যক্তি ও পরিবার বঙ্গ ত্যাগ করে ব্রহ্মপুত্রের অপর পারে চট্টগ্রাম, শ্রীহট্ট, পূর্ব ময়মনসিংহ এবং ত্রিপুরায় বসতি স্থাপন করে। এভাবে ব্রহ্মপুত্রের পূর্বে এদের বিচরণ শুরু হয়। তাই বলা যায়, বল্লাসেনের কালে পূর্ব ময়মনসিংহ কামরুপেরই অধীনে ছিল। এই ব্যাপারে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, এই স্থানান্তরের সময় দত্তবংশের আদিপুরুষ অনন্ত দত্ত বঙ্গ ছেড়ে ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহকুমার কস্তল গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের বংশের এক প্রাচীন কুর্চিনামায় প্রাপ্ত শ্লোকে লেখা আছে, “১০৬১ সনে শ্রীমান অনন্ত দত্ত বল্লাল ভয়ে নিজগুরু শ্রীকণ্ঠ দ্বিজসহ বঙ্গ পরিত্যাগ করিলেন”। তাই এখানে কেবল পশ্চিম ময়মনসিংহের ইতিহাস সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়া যায়, কারণ বঙ্গের অধীনে এই অংশটিই ছিল। তবে পূর্ব ময়মনসিংহের ইতিহাস জানতে হলে কামরুপের ইতিহাস জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক।

 খ্রি. পূ, সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এখানে ভগদত্ত বংশ রাজত্ব করে। এর পর ক্ষত্রিয় ও ব্রহ্মপুত্র বংশের রাজত্ব চলে। হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণের সময় রাজত্ব করছিলেন নারায়ণ বংশীয় রাজা ভাস্করবর্ম। তার পরে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন কলিন্দ বর্ম্মা। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবে বার ভূঞাদের আবির্ভাব হয়। ভূঞাদের অধীনে কামরুপ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এই সুযোগে পূর্ব ময়মনসিংহে কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজ্য সৃষ্টি হয় যেগুলো গারো, কচ্চু প্রভৃতি আদিবাসী দ্বারা শাসিত হতো। এরা কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদনপুর ও সুসঙ্গ, সদরের বোকাইনগর এবং জামালপুরের গড়দলিপায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলো। এটি বল্লা সেনের সমসাময়িক কালের অবস্থা। এই সময়ই অনন্ত দত্ত তার গুরু শ্রীকণ্ঠ দ্বিজ সহ কামরুপে আসেন। এরাই ছিলেন পূর্ব ময়মনসিংহের প্রথম ভদ্র উপনিবেশ। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলের কামরুপের প্রভাব কমতে শুরু করে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তর ভাগে তথা সুসঙ্গ পাহাড়ি অঞ্চল বৈশ্যা মন্দা নামক একজন গারো রাজত্ব করছিলো। সোমেশ্বর পাঠক নামীয় পরাক্রান্ত ভ্রমনকারী এই বৈশ্যা মান্দাকে সূকোঁশলে পরাজিত করে সুসঙ্গের শাসন অধিকার করেন। তিনি কান্যকুব্জ থেকে পূর্ব বঙ্গে এসেছিলেন ১২৮০ সালে। এই ঘটনাগুলো থেকে জানা যায় যে দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই পূর্ব ময়মনসসিংহে আদিবাসীদের শাসনের অবসান ঘটে।

ভাটী ছিল কামরুপের রাজধানী। চতুর্দশ শতাব্দীতে এই রাজধানী ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী জিতারী কর্তৃক অধিকৃত হয়।মুসলিম ঐতিহাসিকগণ মেঘনা নদীর পশ্চিম তট-ভূমিকে ভাটী বলে নির্দেশ করেছেন।আবার অনেক প্রাচীন লিখনে ময়মনসিংহের পূর্ব প্রান্তের খালিয়াজুরিকে ভাটী নামে অভিহিত করা হয়েছে। জানা যায় কয়েক শতাব্দী পূর্বে লম্বোদর   নামক ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী এদেশে এসে ভাটীর শাসন অধিকার করেন। এই সন্ন্যাসীর বংশ এখনও বর্তমান আছে। এই বংশের পূর্বপুরুষেরা দিল্লীশ্বর বাদশাহ জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ভাটী মুল্লুকের পাঞ্জাফরমান পেয়েছিলেন। এতে মনে হয় আসলেই তারা এই অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন। সুতরাং এই সময় থেকে পূর্ব ময়মনসিংহের পূর্বভাগের সাথেও কামরুপের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় কারণ ভাটী পূর্ব অংশে ছিল। কিন্তু তখনও জঙ্গলবাড়ি, বোকাইনগর, মদনপুর, গড়দলিপা প্রভৃতি স্থান হাজংদের দ্বারা শাসিত হচ্ছিলো। তখনও মুসলিম অধিবাসীরা পূর্ব ময়মনসিংহে প্রবেশ করে নি।

বাঙ্গালার শেষ হিন্দু রাজা বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্ণণ সেনের রাজত্বের শেষ দিকে এ অঞ্চলে অভ্যন্তরীন কোন্দল দেখা দেয়। ১২০৪ সালে মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষ্ণণ সেন তখন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রতিরোধ না করে তক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা মুসলিম শাসনাধীনে আসে। বখতিয়ার তার সম্রাজ্যকে দুইটি অংশে ভাগ করেন: মিথিলা এবং রাঢ়ের রাজধানী লক্ষ্ণণাবতীতে (গৌড়) স্থাপিত হয় যা মুসলিম ইতিহাসে লখনৌতি নামে পরিচিত; অপর অংশ গঠিত হয় আরও পূর্বদিকে উত্তর বঙ্গ বা বরেন্দ্র অঞ্চল। তার রাজত্বের সীমানা উল্লেখ করা হয়: পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী; দক্ষিণে পদ্মা নদী; উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট হয়ে রংপুর শহর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে বিহার পর্যন্ত যা বখতিয়ার আগেই অধিকার করেছিলেন। এ হিসেবে দেখা যায় পূর্ব বঙ্গ বখতিয়ারের অধীনে আসেনি, অতএব ময়মনসিংহের (তথা কামরুপের) কোন অংশই নয়। তবে বখতিয়ার কামরুপে অভিযানে বের হয়েছিলন। কিন্তু বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদীর কারণে আর এগোতে পারেননি।

জাভেদ ইকবাল।
সহঃ সম্পাদক
MymensinghNews.com

এই বিভাগের আরও খবর